বজ্রপাতে থমকে গেলো জীবনের ছন্দ—জামালপুরে নিহত ২, আহত ৪
বিশেষ প্রতিবেদন:
জামালপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সাম্প্রতিক বজ্রপাতের ঘটনায় আবারও গ্রামবাংলার মানুষের জীবনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এক বিকেলের হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত কেড়ে নিয়েছে দুইটি তাজা প্রাণ, আহত হয়েছেন আরও চারজন। একই সঙ্গে মারা গেছে কয়েকটি গবাদিপশু-যা গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
গত রবিবার (২৬ এপ্রিল) বিকাল ৩টার দিকে জামালপুর সদর উপজেলা-এর লক্ষ্মীরচর ইউনিয়নের চর যথার্থপুর গ্রামের ভাটিপাড়া এলাকায় বজ্রপাতে নিহত হন হাসমত আলী হাসু (৪৫)। তিনি ওই এলাকার হাবিবর রহমান মন্ডলের ছেলে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেলে গরু আনতে মাঠে গেলে হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। বাড়ি ফেরার পথে বজ্রপাত হলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল-এ নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
একই ঘটনায় সদর উপজেলায় আনোয়ার হোসেন (৩৪), শাওন (২৫) ও সুখী (১৪) আহত হন। আহতদের মধ্যে আনোয়ার হোসেনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনায় কৃষক পরিবারের আর্থিক ক্ষতিও কম নয়। তুলশির ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল হান্নানের দুটি মহিষ এবং নিহত হাসমত আলীর একটি গরু মারা গেছে। অন্যদিকে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা-এ আরও চারটি গরু বজ্রপাতে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে জেলার মেলান্দহ উপজেলা-এ নিজ বাড়িতে রান্না করার সময় বজ্রপাতে মারা যান মর্জিনা বেগম (২২) নামে এক গৃহবধূ। তিনি এক সন্তানের জননী ও স্থানীয় রাজিবের স্ত্রী। পরিবারের জন্য রান্না করার সময় আকস্মিক বজ্রপাতে তিনি মাটিতে পড়ে যান। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় শেফালী (২৮) নামে আরেক নারী আহত হয়েছেন।
বাড়ছে বজ্রপাতের ঝুঁকি:
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ওপর সক্রিয় বৃষ্টিবলয়ের কারণে আগামী সপ্তাহজুড়ে ঝড়, প্রবল বৃষ্টিপাত ও বজ্রপাতের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের তীব্রতা ও সংখ্যা বাড়ছে, যা গ্রামীণ জনজীবনের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সহায়তা ও সতর্কতা:
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের পরিবার আবেদন করলে সরকারি বিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৃষ্টি ও বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, গাছের নিচে বা পানির ধারে অবস্থান না করে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার জন্য সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে। মাইকিং ও বিভিন্ন মাধ্যমে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ:
এই ঘটনাগুলো আবারও মনে করিয়ে দেয়- গ্রামের কৃষক, গৃহবধূ ও শিশুদের জীবন কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগে। বজ্রপাত শুধু প্রাণহানি নয়, পরিবারগুলোর আর্থিক ও মানসিক জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি, বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা স্থাপন এবং মাঠ পর্যায়ে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে এমন অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।
