॥ সাইদ পারভেজ তুহিন ॥
বাংলার শতবর্ষী ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন কাঁসা শিল্প। একসময় জামালপুর, বিশেষ করে ইসলামপুর অঞ্চলের কাঁসার তৈরি থালা, বাটি, গ্লাস, কলস, পূজার সামগ্রী ও নানান গৃহস্থালি পণ্যের সুনাম ছিল দেশজুড়ে। দক্ষ কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি এসব পণ্য শুধু দৈনন্দিন ব্যবহারেই নয়, বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই গৌরবময় কাঁসা শিল্প আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।
কাঁসা শিল্পের সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, আধুনিক স্টিল, মেলামাইন ও প্লাস্টিকের সস্তা পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার, পর্যাপ্ত বাজারজাতকরণের অভাব, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতি এবং নতুন প্রজন্মের এই পেশায় অনাগ্রহ সব মিলিয়ে শিল্পটি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। অনেক কারিগর বাধ্য হয়ে পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। ফলে শত বছরের ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
এই শিল্প শুধু একটি পেশা নয় ; এটি জামালপুরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ। কাঁসা শিল্প টিকিয়ে রাখা মানে আমাদের শিকড় ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া গেলে এই শিল্প আবারও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলে দিতে পারে। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও হস্তশিল্পের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, বিসিক, জেলা প্রশাসন এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কারিগরদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, কাঁচামাল সহজলভ্য করা, নিয়মিত মেলা ও প্রদর্শনীর আয়োজন, অনলাইন বিপণনের সুযোগ সৃষ্টি এবং ভৌগোলিক নির্দেশক (এও) স্বীকৃতির উদ্যোগ নেওয়া হলে কাঁসা শিল্প নতুন প্রাণ ফিরে পেতে পারে। পাশাপাশি তরুণদের এই শিল্পে আগ্রহী করে তুলতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়াও জরুরি।
জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা শিল্পকে হারিয়ে যেতে দেওয়া মানে আমাদের ইতিহাসের একটি মূল্যবান অধ্যায়কে হারিয়ে ফেলা। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগেই সম্ভব এই ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং আগামী প্রজন্মের কাছে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরা।
